তার ভাষায়, ‘অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আগে নিচে নেমে যাওয়া স্তরকে ওপরে তুলতে হবে।’ তিনি গতকাল ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭; প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণত বাজেট প্রস্তুতিতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগে। তার ওপর পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ায় চ্যালেঞ্জ আরো বেড়েছে। তার পরও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি কার্যকর বাজেট দেয়ার চেষ্টা করছে। এ বাজেটের মূল লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে।’
বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে অর্থমন্ত্রী ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’ বা ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি’র কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি মানুষ ও গোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং উন্নয়নের সুফল সবার ঘরে পৌঁছাতে হবে। বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে দরিদ্র, নিম্ন আয়ের ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে ইউনিভার্সাল ও প্রাইমারি হেলথকেয়ারে জোর দেয়া হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ কম খরচে চিকিৎসাসেবা পায়। সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে এবার বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাজ ব্যবসা-বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করা নয়; বরং সহায়তা করা। এজন্য অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আনা হবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার “ডিরেগুলেশন” বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনীতি গঠনের পথে হাঁটছে, যাতে নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা হয়রানি ছাড়া সেবা পান।’
বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প ড্যাশবোর্ডের আওতায় আনা হবে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কোনো প্রকল্প পিছিয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতে সব উন্নয়ন প্রকল্প চারটি মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হবে—ভ্যালু ফর মানি, বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত প্রভাব। এসব মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো প্রকল্পে অনুমোদন দেয়া হবে না।’ পূর্ববর্তী সরকারের নেয়া অনেক প্রকল্প এরই মধ্যে পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শেয়ারবাজার ও ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অতীতে লুটপাট ও অনিয়মের কারণে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেয়া হবে। ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ দেয়া হবে, যাতে ব্যাংকের ওপর ঋণের চাপ কমে। সরকার বর্তমানে ব্যাংক পুনমূলধনীকরণ নিয়ে কাজ করছে, যাতে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসে এবং ব্যাংকগুলো আবার ঋণ দিতে সক্ষম হয়।’
সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আসন্ন বাজেটের আকার বড় হওয়াটা স্বাভাবিক, কারণ বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং নতুন সরকারের নানা রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এ ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে। গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। রাজস্ব ব্যবস্থায় মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া কেবল লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সুদের হার আরো বাড়বে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটানোর প্রবণতা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সরকার একদিকে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করছে, অন্যদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যা নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ সংকটজনিত।’ এ অবস্থায় কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি, পরিবহন ও লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) বণ্টন ব্যবস্থায় সংস্কার করা দরকার। একই সঙ্গে বিদেশী ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান নীতি থাকা প্রয়োজন। দ্বৈত করের কারণে বিনিয়োগকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং পুনর্বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। তাছাড়া জমির মিউটেশন, পরিবেশ ছাড়পত্র ও বিভিন্ন লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।’ এ সময় তিনি শিপিং খাতের কর সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং পুরনো আইন (১৯৭৪ সালের পেট্রোলিয়াম আইন) সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান।
সেমিনারে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব উদ্যোগে জমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো গড়ে শিল্প পরিচালনা করছেন। এখন শিল্প আধুনিকায়নের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারি কেনায় বিশেষ তহবিল সহায়তা দরকার, যা পেলে উৎপাদনশীলতা ৩০-৪০ শতাংশ এবং কোথাও ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ খরচও প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব।’ তিনি নীতি গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও ধীর সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেন এবং দ্রুত, প্রো-অ্যাকটিভ সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান।